ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার অর্থনীতি পুনর্গঠনে শক্তিশালী উন্নয়ন পরিকল্পনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অবকাঠামো, আবাসন ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১০ বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলার তহবিল প্রয়োজন। খবর দ্য ন্যাশনাল।
রামাল্লার আরব আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও আর্থিক বিষয়ের অধ্যাপক নাসের মুফরেজ বলেন, ‘গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য অন্তত ১০ বছরে ৪-৫ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। প্রক্রিয়াটি সফল করতে তিনটি শর্ত পূরণ জরুরি। প্রথমত, পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলি অবরোধের অবসান এবং তৃতীয়ত, একীভূত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।’
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও হামাস ছয় সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা গতকাল রোববার কার্যকর হয়। এ চুক্তির আওতায় গাজার অর্থনীতি পুনর্গঠনের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, হামাস ৩৩ জন ইসরায়েলিকে মুক্তি দেবে। বিনিময়ে ইসরায়েল বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। এছাড়া ইসরায়েলি সেনারা গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে পিছু হটে সীমান্তের নিকটবর্তী অবস্থানে যাবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে গৃহহীন ফিলিস্তিনিদের ঘরে ফেরানো এবং অসুস্থ ও আহতদের বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল থানি।
চুক্তির প্রথম ধাপে বড় পরিসরে মানবিক সহায়তা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্গঠন ও বেকারি চালুর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি সরবরাহ ও গৃহহীনদের জন্য তাঁবু ও অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির পর গাজার জন্য একটি সমন্বিত নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বাইব্লস ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ নাসিব গোব্রিল বলেন,”‘একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশদ নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করা উচিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘বহু জায়গায় পুনর্গঠন প্রয়োজন। তাই অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তাও বিপুল। কিন্তু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থায়নের সামর্থ্য নেই। একটি সুস্পষ্ট, সমন্বিত এবং বিশদ উন্নয়ন ও পুনর্গঠন পরিকল্পনার ওপর অর্থায়নের উৎস নির্ভর করবে। পাশাপাশি তহবিলের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহারের ওপর অর্থ প্রবাহ নির্ভর করবে।’
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে এখন পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৭০০ জনের বেশি নিহত এবং এর দ্বিগুণের বেশি আহত হয়েছে। ফিলিস্তিনের ২৩ লাখ মানুষের অধিকাংশ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গত মাসে সতর্ক করে জানিয়েছিল, গাজা যুদ্ধ ফিলিস্তিনের অর্থনীতিকে”‘অভূতপূর্ব মাত্রার সংকটে’ ফেলে দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত বছর ফিলিস্তিনের প্রকৃত জিডিপি ২৬ শতাংশ কমে গেছে, যা দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পতন। গত বছরের প্রথমার্ধে গাজার অর্থনীতি ৮৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আর পশ্চিম তীরের অর্থনীতির আকার কমে গেছে ২৩ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে গাজার বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৩২৮ ডলার, তা গত বছর ডিসেম্বরে কমে ২০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
ইসরায়েলের হামলায় গাজার অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে বেকারত্ব, পণ্যের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে জরুরি সেবাগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজার ৬৬ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ২২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ধ্বংসযজ্ঞ বাণিজ্য খাতকে ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শ্রমবাজারেও মারাত্মকভাবে পড়েছে। গাজায় বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের যৌথ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গাজার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোয় প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের ক্ষতি হয়েছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাজা ও ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরের উন্নয়ন কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে পারে।